Requirements not met

Your browser does not meet the minimum requirements of this website. Though you can continue browsing, some features may not be available to you.


Browser unsupported

Please note that our site has been optimized for a modern browser environment. You are using »an unsupported or outdated software«. We recommend that you perform a free upgrade to any of the following alternatives:

Using a browser that does not meet the minimum requirements for this site will likely cause portions of the site not to function properly.


Your browser either has JavaScript turned off or does not support JavaScript.

If you are unsure how to enable JavaScript in your browser, please visit wikiHow's »How to Turn on Javascript in Internet Browsers«.


Your browser either has Cookies turned off or does not support cookies.

If you are unsure how to enable Cookies in your browser, please visit wikiHow's »How to Enable Cookies in Your Internet Web Browser«.

 

Language / ভাষা:

হাইলাইট:

এই বিভাগে

নিউজ লেটার

Please subscribe to our newsletter to receive current news highlights, as well as news and information about Doinik Ekattorer Chetona.

বিজ্ঞাপন

  • Bangladesh Heritage and Ethnic Society of Alberta · Promoter of Bangladeshi Culture and Heritage in and around Edmonton
  •  Bangladesh Heritage and Ethnic Society of Alberta (BHESA) · Promoter of Bangladeshi Culture and Heritage in and around Edmonton
  • Document Preparation Service from EdmontonOaths Alberta Commissioner of Oaths Services
  • Celebration of Mother Language, Culture and Heritage at MotherLanguageDay.ca
  • Legal Witnessing Service from EdmontonOaths Alberta Commissioner of Oaths Services
  • Samajkantha Online Inc. · The Voice of Society · Bengali online news magazine
  • Asian News and Views · Bengali online news magazine

Bengali Fonts

You need to install at least one Bengali font to read or write Bengali.

We offer a .ZIP-File true type font for download. Read the following installation instructions to see how to install the font.

আন্তর্জাতিক

নেপালে সর্বশেষ বন্যা পরিস্থিতি : ধ্বংসস্তূপের মাঝে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, শঙ্কায় বেঁচে যাওয়া মানুষ

ঢাকা, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, সংবাদসংস্থা বাসস জানায় : নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় গোরখা জেলায় আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও গবাদিপশু হারিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন বেঁচে যাওয়া মানুষ। কয়েক মিনিটের প্রবল পানির স্রোতে তছনছ হয়ে গেছে বহু পরিবারের সাজানো জীবন। কাদায় অর্ধেক ডুবে থাকা বাড়িঘরের পাশে দাঁড়িয়ে ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে আছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত রোববার বুড়ি গণ্ডকী নদীর পানি আকস্মিকভাবে বেড়ে গিয়ে গোরখা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এ ঘটনায় প্রায় ২০০টি বাড়ি ও পাঁচটি সেতু ভেসে গেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়নি। তবে অন্তত ছয়জন নিখোঁজ রয়েছেন এবং তিনটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

৩৩ বছর বয়সী অজয় গুরুং বন্যায় নিজের দোকান ও গবাদিপশু হারিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে ট্রেকিং গাইড হিসেবে কাজ করা গুরুং বলেন, নিজের চোখের সামনে সবকিছু ভেসে যেতে দেখেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘এখন সবকিছু শেষ। বসবাসের জন্য এখন আমাকে বিকল্প কোনো জায়গা খুঁজতে হবে।’

প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই ট্রেকিং গাইড জানান, মানাসলু সার্কিট এলাকায় এত ব্যাপক ভূমিধস তিনি আগে কখনো দেখেননি। তাঁর আশঙ্কা, হিমালয়ের তুষারাবৃত পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর তীরে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

বুড়ি গণ্ডকীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজেদের ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী উদ্ধারের চেষ্টা করছেন বাসিন্দারা। অনেকে হারিয়েছেন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন, আবার কারও কারও মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও অবশিষ্ট নেই।

ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা লাল কুমারী থাপা জানান, বন্যায় তাঁর কলাবাগান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন কেবল একটি ছোট কুঁড়েঘর অবশিষ্ট রয়েছে। অন্যদের ক্ষতি আরও ভয়াবহ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকের বাড়ির চালের সামান্য অংশও অবশিষ্ট নেই। কারও কাছে পরার মতো কাপড়ও নেই।

### ধারাবাহিক দুর্যোগে বাড়ছে উদ্বেগ

নেপালের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি দেশটিকে দীর্ঘদিন ধরেই বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর আশপাশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।

গত আগস্টে দেশটির উত্তরের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে ব্যাপক প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। প্রতিবেদনে ওই দুর্যোগে এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর এবং পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের নিখোঁজ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বুড়ি গণ্ডকীর সর্বশেষ বন্যার দুই মাসেরও কম সময় আগে ঘটে যাওয়া এ বিপর্যয় নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্যোগঝুঁকিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

এ ছাড়া গত মাসে ভারী মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে বরফ, পাথর ও পানির আকস্মিক প্রবাহজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। রাসুয়া জেলার দুর্যোগেও জলবায়ু পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, সর্বশেষ বন্যাটিও পাথর ও বরফের ধসের কারণে সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি বলেন, চলতি বছরে একের পর এক দুর্যোগের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে। ঘন ঘন দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি পাহাড়ি এলাকাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

তিনি জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে পাহাড়ি অঞ্চলের পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা এখন বড় চ্যালেঞ্জ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জোরদারের উদ্যোগ চললেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে বিপদের আশঙ্কা এখন বাস্তব অভিজ্ঞতা। দিল কুমারী থাপা মাগার কয়েক সপ্তাহ আগে মুঠোফোনে রাসুয়া জেলার ভয়াবহ বন্যার দৃশ্য দেখেছিলেন। দূরবর্তী এলাকার সেই বিপর্যয় তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছিল। এবার একই ধরনের দুর্যোগ আঘাত হেনেছে তাঁর নিজের এলাকায়।

তিনি বলেন, ‘আমরা রাসুয়ার বন্যার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। জায়গাটি বেশ দূরে ছিল। কিন্তু বন্যার দৃশ্য দেখে আমরা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমরাই বন্যার শিকার হয়েছি।’

সাম্প্রতিক এ দুর্যোগ নেপালের পাহাড়ি জনপদে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা ও পুনর্বাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি ব্যবস্থাপনা, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ছবি : এআই

হয়রানি, মব-সন্ত্রাস ও আইনের শাসন: ‘টেরোরিস্ট’ আখ্যা কি অপরাধ, নাকি রাজনৈতিক মতপ্রকাশ?

 অন্তর্বর্তীকালীন (বাংলাদেশের সংবিধানে অসমর্থিত) সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হেনস্তা এবং অনলাইনে অপপ্রচার ও শারীরিক হুমকি প্রদানের অভিযোগে সাবেক উপদেষ্টারা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক উপদেষ্টারা এ ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ, অপপ্রচার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশ সরকারও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।

ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, বিস্ময় ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে—এটি অনেকের কাছে হয়তো অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে কোনো ব্যক্তির আন্তর্জাতিক পরিচিতি বা রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা এবং আইনসম্মত আচরণ পাওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকা নিয়ে মতপার্থ্যক্য রয়েছে । একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনসমালোচনা বা প্রতিবাদের অধিকারও গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জুলাই ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ: ন্যায়বিচার, প্রতিশোধ ও মব-সংস্কৃতি

বাংলাদেশে জুলাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থান রাষ্ট্র, সরকার, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিযোগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি অনাস্থা এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি সরকার পরিবর্তন-পরবর্তী সময়ে জননিরাপত্তা, প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, গণপিটুনি এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।

এ প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: জনগণের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা যখন রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার বাইরে প্রতিশোধ, গণচাপ কিংবা জনতার শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তখন তা কি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, নাকি বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও গভীর করে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মব জাস্টিস, মব লিঞ্চিং, চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ভূমিকা এবং জননিরাপত্তার সংকটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না। বরং রাষ্ট্রের বৈধ কর্তৃত্ব, আইনের শাসন ও সামাজিক নৈতিকতার পারস্পরিক সম্পর্কের আলোকে এসব ঘটনার মূল্যায়ন প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের বৈধ কর্তৃত্ব, আইনের শাসন ও সামাজিক নৈতিকতা

রাষ্ট্রের বৈধ কর্তৃত্ব, আইনের শাসন ও সামাজিক নৈতিকতা একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের অপরিহার্য তিনটি ভিত্তি। রাষ্ট্রের বৈধ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় সংবিধান, আইন, জনগণের সম্মতি এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির মাধ্যমে। আইনের শাসন নিশ্চিত করে যে সরকার, রাজনৈতিক দল, ক্ষমতাবান ব্যক্তি কিংবা সাধারণ নাগরিক—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব যখন আইনসম্মত ও জনকল্যাণমুখী না হয়ে ভয়ভীতি, দমন-পীড়ন কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার বিপন্ন হয়।

সামাজিক নৈতিকতা বলতে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, মানবিক মর্যাদা রক্ষা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেকসম্পন্ন অবস্থান গ্রহণকে বোঝায়। কোনো অভিযোগের বিচার জনতার হাতে ছেড়ে দেওয়া, মব-সহিংসতাকে সমর্থন করা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে ন্যায়বিচার হিসেবে উপস্থাপন করা আইনের শাসনের পরিপন্থী। প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজে অপরাধের অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং প্রমাণের ভিত্তিতে—উন্মত্ত জনতার চাপ বা সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছায় নয়।

অতএব, রাষ্ট্রের বৈধ কর্তৃত্ব, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং সামাজিক নৈতিকতার সমন্বয়ই বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিরোধ, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র গঠনের প্রধান শর্ত।

মব-সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন

বাংলাদেশে জুলাই ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য ও সমালোচনায় মব-সন্ত্রাসে উসকানি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—প্রকাশ্যে মানুষকে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার আহ্বান, প্রায় ৪,৫০০ শিক্ষককে জুতার মালা পরানো, মারধর ও জোরপূর্বক চাকরিচ্যুত করার ঘটনা, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ এবং শিল্পকারখানায় হামলার ফলে কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ।

এ ছাড়া হামের টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া ও শিশুদের মৃত্যুর মধ্যে সম্পর্ক, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের জন্য একাধিক লাইসেন্স গ্রহণ, মবের চাপের মুখে বিচারপতিদের পদত্যাগ এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসের মতো বিষয়ও রাজনৈতিক ও নৈতিক বিতর্কের অংশ হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও এ আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

এসব অভিযোগের প্রতিটি বিষয় পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল ঘটনায় সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো একটি কারণকে দায়ী করা উচিত নয়। একইভাবে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতায় উসকানি কিংবা বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠলে তা রাজনৈতিক বক্তব্যের স্তরে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনা উচিত।

মূল প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কি ন্যায়বিচারের মানদণ্ডও পরিবর্তিত হবে? কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় কি তাঁদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা নিষিদ্ধ হবে? আবার রাজনৈতিক বিরোধী হওয়ার কারণে কাউকে প্রমাণ ছাড়াই অপরাধী সাব্যস্ত করা কি গ্রহণযোগ্য হবে? উভয় ক্ষেত্রেই উত্তর হওয়া উচিত—না। জবাবদিহি হতে হবে সর্বজনীন, নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর।

টেরোরিস্ট’ আখ্যা: হয়রানি, মানহানি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে নিউইয়র্ক বিমানবন্দরের ঘটনার আলোচনায় কয়েকজন তাঁকে ‘টেরোরিস্ট’ বা ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন উঠেছে: কাউকে প্রকাশ্যে ‘টেরোরিস্ট’ বলা কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়রানি বা শাস্তিযোগ্য অপরাধ?

এর উত্তর দিতে হলে হয়রানি, হুমকি, মানহানি এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। হয়রানি বলতে প্রযোজ্য আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী এমন আচরণ বা যোগাযোগকে বোঝায়, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভয়ভীতি, নিপীড়ন বা গুরুতর মানসিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। তবে সব ধরনের কঠোর সমালোচনা, নেতিবাচক মন্তব্য কিংবা অপমানজনক শব্দের ব্যবহারই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়রানি বা অপরাধ নয়।

কোনো ব্যক্তিকে ‘টেরোরিস্ট’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে—শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে বক্তব্যদাতাকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না। বক্তব্যটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সমালোচনা কিংবা কোনো কর্মকাণ্ডের প্রতি ক্ষোভের প্রকাশ কি না, তা ও বিবেচনা করতে হবে। অন্যদিকে, কাউকে সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ন করা হলে মানহানির প্রশ্ন উঠতে পারে। বক্তব্যের সত্যতা, প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য, প্রকাশের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৯৯ ধারায় মানহানির সংজ্ঞা এবং ৫০০ ধারায় এর শাস্তির বিধান রয়েছে; একই সঙ্গে আইনে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমও স্বীকৃত। অন্যদিকে, ৫০৩ ধারায় অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শনের বিষয়টি নির্ধারিত হয়েছে হুমকি ও তার উদ্দেশ্যের মতো উপাদানের ভিত্তিতে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে সংঘটিত ঘটনার আইনগত মূল্যায়নে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ফেডারেল, নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য ও প্রযোজ্য স্থানীয় আইন বিবেচ্য হবে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধির বিধান সরাসরি ওই ঘটনার ওপর প্রয়োগ করা যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।

সুতরাং, ‘টেরোরিস্ট’ আখ্যা দেওয়ার ঘটনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়রানি বা অপরাধ বলা আইনগতভাবে যথার্থ নয়। একইভাবে, প্রতিটি পরিস্থিতিতে এমন বক্তব্যকে অপরাধমুক্ত ঘোষণা করাও সঠিক হবে না। বক্তব্যের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য হুমকি, বেআইনি ভীতি প্রদর্শন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানহানি কিংবা অন্য কোনো অপরাধের উপাদান যুক্ত আছে কি না, সেটিই নিরপেক্ষ মূল্যায়নের বিষয়।

 

দেলোয়ার জাহিদ

রাজনৈতিক সুবিধাভোগিতা নয়, নীতির ধারাবাহিকতা

ড. ইউনূসের প্রতি সমর্থন কিংবা বিরোধিতা—কোনোটিই আইনের প্রয়োগের মানদণ্ড হতে পারে না। সাবেক উপদেষ্টাদের প্রতিবাদকে তাঁদের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে; তবে তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্বার্থান্বেষী বা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে চিহ্নিত করাও যুক্তিসংগত নয়।

একইভাবে, কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক কারণে হয়রানি করা হলে তার প্রতিবাদ করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাঁর দায়িত্বকালীন কর্মকাণ্ড, নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও নাগরিকদের রয়েছে। গণতন্ত্রে ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তির জবাবদিহি পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক।

জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা যদি মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক সংস্কার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকে, তাহলে সেই আদর্শের পরীক্ষা হবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও। যারা মব-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের ন্যায়বিচার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিবাদকারীদের মতপ্রকাশের অধিকারও যথাযথভাবে রক্ষা করতে হবে।

ব্যক্তির মর্যাদা ও জবাবদিহি—দুটিই গণতন্ত্রের শর্ত

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং বাংলাদেশে মব-সন্ত্রাস ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে চলমান বিতর্ক আমাদের একটি মৌলিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: গণতন্ত্র কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; এটি আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং জবাবদিহির ধারাবাহিক অনুশীলন।

কোনো ব্যক্তির প্রতি অসম্মানজনক আচরণ, শারীরিক হুমকি বা বেআইনি ভয়ভীতি প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করা বা ‘টেরোরিস্ট’ আখ্যা দেওয়ার ঘটনাকে প্রেক্ষাপট ও আইনি উপাদান যাচাই না করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করাও ন্যায়সংগত নয়। অপরাধের অভিযোগের বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাবের ভিত্তিতে নয়।

অতএব, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—মব-সহিংসতার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে আইনগত দায়বদ্ধতার ভারসাম্য বজায় রাখা। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ রক্ষা কিংবা জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের নামে কোনো পক্ষকেই আইনের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন প্রতিশোধ নয়, প্রমাণ; জনতার শাস্তি নয়, স্বাধীন বিচার; এবং রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, সর্বজনীন নৈতিকতা।

**রাষ্ট্রের শক্তি জনতার ভয় সৃষ্টিতে নয়, নাগরিকের অধিকার রক্ষায়; গণতন্ত্রের শক্তি বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করায় নয়, বরং ভিন্নমতকে আইনের সুরক্ষার মধ্যে সহাবস্থানের সুযোগ দেওয়ায়। এই নীতিই হতে পারে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে উত্তরণের পথ।


//দেলোয়ার জাহিদ//

জীবনের দীর্ঘ পথচলায় মানুষ অনেক পরিচয়ে পরিচিত হয়—শিক্ষক, লেখক, সংগঠক, সম্পাদক, সমাজকর্মী কিংবা কর্মজীবনের যোদ্ধা হিসেবে। কিন্তু সময়ের শেষ প্রান্তে এসে উপলব্ধি করি, এই সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে যে পরিচয়টি সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে অর্থবহ, তা হলো—একজন পিতা হওয়া।

আশির দশক থেকে আমার জীবন নানা অভিজ্ঞতার বুননে গড়ে উঠেছে। বেসরকারি কলেজের শিক্ষকতা, সংবাদপত্র সম্পাদনা, সামাজিক সংগঠন পরিচালনা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে মানুষের জন্য কিছু করার এক নিরন্তর প্রয়াস ছিল আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। কৈশোর ও যৌবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে কুমিল্লার একটি নিবন্ধিত সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। শতাধিক শিশু, কিশোর ও যুবককে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে আমরা বহু সফল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। তারও আগে, স্বাধীনতার মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিক্ষেত্র পেরিয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করি। সেই জীবন আমাকে শিখিয়েছে সংগ্রাম, দায়িত্ব ও মানুষের প্রতি অঙ্গীকারের মূল্য।

কিন্তু আজ ফিরে তাকিয়ে দেখি, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আমি পেয়েছি আমার সন্তানদের বড় হতে দেখার মধ্য দিয়ে।

এক সময় ছিল যখন আমি আমার কন্যা ইশরাত জাহান মৌমিকে বিভিন্ন সম্মেলন, সামাজিক অনুষ্ঠান, কর্মশালা কিংবা শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করতাম। কিন্তু সে ছিল নিজের জগতে নিবিষ্ট, নিজের স্বপ্ন ও ভাবনার পথে চলতে আগ্রহী। অনেক সময় মনে হতো, আমি যে মূল্যবোধ, যে অভিজ্ঞতা কিংবা যে শিক্ষা তাকে দিতে চাই, সেগুলো আদৌ তার ভেতরে কোনো বীজ রোপণ করতে পারছে কি না।

আজ বুঝি, সন্তানকে শেখানো মানে তাকে নিজের প্রতিচ্ছবি বানানো নয়; বরং তাকে তার নিজস্ব সত্তাকে আবিষ্কারের সুযোগ করে দেওয়া। প্রকৃত শিক্ষা কখনো চাপিয়ে দেওয়া যায় না—তা সময়ের গভীরে নীরবে অঙ্কুরিত হয়।

২০২৬ সালের ৫ জুন, অটোয়ায় অনুষ্ঠিত CASWE-ACFTS জাতীয় সম্মেলনে যখন আমার কন্যা ইশরাত কানাডার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত গবেষক, শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীদের সামনে তার গবেষণাপত্র উপস্থাপন করছিল, তখন আমি একজন দর্শক ছিলাম না; আমি যেন সময়ের এক দীর্ঘ যাত্রাপথের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অপেক্ষায় ছিলাম ।

তার গবেষণার বিষয় ছিল—‘কোভিড-১৯ চলাকালীন অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার শিকারদের সহায়তা: সমাজকর্মে আন্তঃসংযুক্ত ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা’। বিষয়টির গভীরতা আমাকে মুগ্ধ করেছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আমাকে স্পর্শ করেছে মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা, সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তার অঙ্গীকার এবং মানবিক মর্যাদার পক্ষে তার অবস্থান।

সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো, জীবনের প্রকৃত সার্থকতা ব্যক্তিগত অর্জনে নয়; বরং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে মানবতার মশালটি তুলে দিতে পারার মধ্যে নিহিত।

আমরা পিতামাতারা প্রায়ই ভাবি, আমাদের সন্তানদের আমরা গড়ে তুলি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করি, আমরা কেবল মাটিকে প্রস্তুত করি; বীজের ভেতরে যে সম্ভাবনা নিহিত থাকে, তার বিকাশের নিজস্ব নিয়ম আছে। একটি বৃক্ষ যেমন নিজের সময়ে ফুল ফোটায়, তেমনি একটি সন্তানও নিজের সময়ে তার অন্তর্নিহিত শক্তির প্রকাশ ঘটায়।

একজন পিতা হিসেবে আমি কৃতজ্ঞ—মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে, যিনি তাকে পথ দেখিয়েছেন; সেই সমাজের কাছে, যা তাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে; এবং সেই সব মানুষদের কাছে, যারা তার জীবনের যাত্রায় সঙ্গী ও সহায়ক হয়েছেন। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ তার জীবনসঙ্গীর প্রতি, যার নীরব সমর্থন, ধৈর্য ও উৎসাহ তার অগ্রযাত্রাকে শক্তিশালী করেছে।

আমার কাছে এই সাফল্য কেবল একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপনার ঘটনা নয়। এটি সময়, শিক্ষা, মূল্যবোধ, অধ্যবসায় এবং মানবিক চেতনার এক দীর্ঘ অভিযাত্রার প্রতীক।

আজ আমি বিশ্বাস করি, সন্তানের সাফল্যে একজন পিতার আনন্দ কেবল গর্বের আনন্দ নয়; এটি এক ধরনের আত্মদর্শন। সেখানে তিনি নিজের অসমাপ্ত স্বপ্নের পূরণ খোঁজেন না, বরং প্রত্যক্ষ করেন নতুন এক মানুষের বিকাশ, যে নিজের আলোয় আলোকিত।

আমার প্রার্থনা একটাই—সে যেন জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে প্রজ্ঞা অর্জন করে, সাফল্যের সঙ্গে নম্রতা ধারণ করে এবং মানুষের সেবাকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে। তার কর্ম যেন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, এবং সে যেন কখনো ভুলে না যায় যে মানুষের প্রতি সহমর্মিতাই সকল জ্ঞানের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।

অবশেষে, জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় এসে আমি উপলব্ধি করি—একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার সন্তানের কত দূর যাওয়া নয়; বরং তাকে সেই মানুষ হিসেবে বিকশিত হতে দেখা, যার জন্য তার জন্ম হয়েছে।

সন্তান যখন নিজের আলোয় উদ্ভাসিত হয়, তখন পিতার হৃদয়ে যে প্রশান্তি জন্ম নেয়, তার কোনো ভাষা নেই। সেটি গর্বেরও ঊর্ধ্বে—সেটি এক নীরব কৃতজ্ঞতা, জীবনের প্রতি, সময়ের প্রতি এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি।

ঢাকা, ১৮ মে, ২০২৬ (বাসস) : জাতিসংঘ সোমবার গাজায় ‘গণহত্যা’ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ‘জাতিগত নির্মূলের’ ইঙ্গিত মেলায় এর নিন্দা জানিয়েছে।

জেনেভা থেকে এএফপি জানায়, নতুন এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর বলেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’, যা বহু ক্ষেত্রে ‘যুদ্ধাপরাধ ও অন্যান্য নৃশংস অপরাধের’ শামিল।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক প্রতিবেদনে ইসরাইলকে ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) নির্দেশনা মেনে গাজায় গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ইসরাইলকে নিশ্চিত করতে হবে যে ‘তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সামরিক বাহিনী যেন গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয় এবং গণহত্যায় উসকানি প্রতিরোধ ও শাস্তি নিশ্চিত করতে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’

প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সময়কাল নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ওই দিন হামাসের নজিরবিহীন হামলার মধ্য দিয়ে গাজা যুদ্ধ শুরু হয়। প্রতিবেদনে প্রাথমিক হামলা ও পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ‘গুরুতর লঙ্ঘন’, যার কিছু যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে, তারও নিন্দা জানানো হয়েছে।

হামাসের হামলায় ইসরাইলি অংশে ১ হাজার ২২১ জন নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক বলে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে এএফপির হিসাব বলছে।

সোমবারের প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে জিম্মিদের ওপর চালানো নির্যাতনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বহু জিম্মি জানিয়েছেন, তারা মাসের পর মাস ‘অমানবিক পরিস্থিতিতে’ আটক ছিলেন এবং নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গাজায় নিহত অধিকাংশ জিম্মি গোপন আটক কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন—হয় অপহরণকারীদের হাতে, নয়তো আশপাশের সংঘাতের প্রভাবে।’

তবে প্রতিবেদনের বেশিরভাগ অংশই গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে, যেখানে ইসরাইলের পাল্টা সামরিক অভিযানে ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, যাকে জাতিসংঘ নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডের বড় একটি অংশ ‘অবৈধ বলে প্রতীয়মান হয়’।

এতে আরও বলা হয়, ইসরাইল ‘বেসামরিক বা সুরক্ষিত স্থাপনা—যেমন স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান—এবং সাংবাদিক, সিভিল ডিফেন্ডার, স্বাস্থ্যকর্মী, মানবিক সহায়তাকর্মী ও পুলিশসহ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ধারাবাহিক ও নিয়মিতভাবে হামলা চালিয়েছে।’

গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ড ওই ভূখণ্ডের বিস্তীর্ণ এলাকার জীবনযাত্রাকে ‘ফিলিস্তিনিদের একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে টিকে থাকার অনুপযোগী’ করে তুলেছে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, ‘পশ্চিম তীরে অপ্রয়োজনীয় ও অসম শক্তি প্রয়োগের ফলে শত শত অবৈধ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।’

‘গাজা ও পশ্চিম তীর উভয় স্থানেই ইসরাইলি সামরিক ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক পরিসরে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছে।’

প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, ‘গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ইচ্ছাকৃত ও অবৈধভাবে ধ্বংস’ এবং ‘পশ্চিম তীরের উত্তরের শরণার্থী শিবিরগুলোর বড় অংশ খালি ও ধ্বংস’ করার ফলে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এতে ‘জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ইসরাইল এই বাস্তুচ্যুতিকে স্থায়ী করতে চায়।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডজুড়ে ইসরাইলের ধারাবাহিক লঙ্ঘনসমূহ সম্মিলিতভাবে ‘ফিলিস্তিনিদের সমষ্টিগত শাস্তি প্রদান’, ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি’, ‘খালি করে দেওয়া’ এবং ‘অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বড় অংশে জাতিগত নির্মূলের’ একটি ধারা নির্দেশ করে।

এতে আরও সতর্ক করা হয়, ‘ইসরাইলি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক, অবমাননাকর ও অমানবিক ভাষা ব্যবহারও দেখা গেছে, যার কোনো জবাবদিহি হয়নি।’

মানবাধিকার দপ্তর জোর দিয়ে বলেছে, প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব লঙ্ঘনের জন্য ‘বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ বিচারিক সংস্থার মাধ্যমে’ যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

এতে বলা হয়, ‘এদিকে সব প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও তদন্ত করতে হবে।’