নেপালে সর্বশেষ বন্যা পরিস্থিতি : ধ্বংসস্তূপের মাঝে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, শঙ্কায় বেঁচে যাওয়া মানুষ
ঢাকা, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, সংবাদসংস্থা বাসস জানায় : নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় গোরখা জেলায় আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও গবাদিপশু হারিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন বেঁচে যাওয়া মানুষ। কয়েক মিনিটের প্রবল পানির স্রোতে তছনছ হয়ে গেছে বহু পরিবারের সাজানো জীবন। কাদায় অর্ধেক ডুবে থাকা বাড়িঘরের পাশে দাঁড়িয়ে ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে আছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত রোববার বুড়ি গণ্ডকী নদীর পানি আকস্মিকভাবে বেড়ে গিয়ে গোরখা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এ ঘটনায় প্রায় ২০০টি বাড়ি ও পাঁচটি সেতু ভেসে গেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়নি। তবে অন্তত ছয়জন নিখোঁজ রয়েছেন এবং তিনটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৩৩ বছর বয়সী অজয় গুরুং বন্যায় নিজের দোকান ও গবাদিপশু হারিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে ট্রেকিং গাইড হিসেবে কাজ করা গুরুং বলেন, নিজের চোখের সামনে সবকিছু ভেসে যেতে দেখেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘এখন সবকিছু শেষ। বসবাসের জন্য এখন আমাকে বিকল্প কোনো জায়গা খুঁজতে হবে।’
প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই ট্রেকিং গাইড জানান, মানাসলু সার্কিট এলাকায় এত ব্যাপক ভূমিধস তিনি আগে কখনো দেখেননি। তাঁর আশঙ্কা, হিমালয়ের তুষারাবৃত পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর তীরে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
বুড়ি গণ্ডকীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজেদের ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী উদ্ধারের চেষ্টা করছেন বাসিন্দারা। অনেকে হারিয়েছেন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন, আবার কারও কারও মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও অবশিষ্ট নেই।
ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা লাল কুমারী থাপা জানান, বন্যায় তাঁর কলাবাগান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন কেবল একটি ছোট কুঁড়েঘর অবশিষ্ট রয়েছে। অন্যদের ক্ষতি আরও ভয়াবহ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকের বাড়ির চালের সামান্য অংশও অবশিষ্ট নেই। কারও কাছে পরার মতো কাপড়ও নেই।
### ধারাবাহিক দুর্যোগে বাড়ছে উদ্বেগ
নেপালের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি দেশটিকে দীর্ঘদিন ধরেই বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর আশপাশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
গত আগস্টে দেশটির উত্তরের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে ব্যাপক প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। প্রতিবেদনে ওই দুর্যোগে এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর এবং পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের নিখোঁজ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বুড়ি গণ্ডকীর সর্বশেষ বন্যার দুই মাসেরও কম সময় আগে ঘটে যাওয়া এ বিপর্যয় নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্যোগঝুঁকিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
এ ছাড়া গত মাসে ভারী মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে বরফ, পাথর ও পানির আকস্মিক প্রবাহজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। রাসুয়া জেলার দুর্যোগেও জলবায়ু পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, সর্বশেষ বন্যাটিও পাথর ও বরফের ধসের কারণে সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি বলেন, চলতি বছরে একের পর এক দুর্যোগের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে। ঘন ঘন দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি পাহাড়ি এলাকাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে পাহাড়ি অঞ্চলের পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা এখন বড় চ্যালেঞ্জ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জোরদারের উদ্যোগ চললেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে বিপদের আশঙ্কা এখন বাস্তব অভিজ্ঞতা। দিল কুমারী থাপা মাগার কয়েক সপ্তাহ আগে মুঠোফোনে রাসুয়া জেলার ভয়াবহ বন্যার দৃশ্য দেখেছিলেন। দূরবর্তী এলাকার সেই বিপর্যয় তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছিল। এবার একই ধরনের দুর্যোগ আঘাত হেনেছে তাঁর নিজের এলাকায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা রাসুয়ার বন্যার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। জায়গাটি বেশ দূরে ছিল। কিন্তু বন্যার দৃশ্য দেখে আমরা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমরাই বন্যার শিকার হয়েছি।’
সাম্প্রতিক এ দুর্যোগ নেপালের পাহাড়ি জনপদে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা ও পুনর্বাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি ব্যবস্থাপনা, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ছবি : এআই