দেলোয়ার জাহিদ
বৈশ্বিক অর্থনীতি আজ এক অনিশ্চিত ও বিভাজিত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এই প্রেক্ষাপটে কানাডার প্রধানমন্ত্রী Mark Carney-এর সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা কেবল কানাডার জন্য নয়, বরং বিশ্বব্যাপী—বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
Carney স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন: “Hope is not a strategy, nostalgia is not a solution.”—এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যেই বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার গভীরতা প্রতিফলিত হয়।
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার এক জটিল সমন্বয়। ভৌগোলিক নৈকট্য, বিস্তৃত বাণিজ্য এবং NATO ও NORAD-এর মতো প্রতিরক্ষা জোট দুই দেশকে কৌশলগত অংশীদারে পরিণত করেছে। তবে বাণিজ্য নীতি, জ্বালানি ও পরিবেশগত প্রশ্নে মতপার্থক্যও দীর্ঘদিনের। NAFTA-এর সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক উত্তেজনা পর্যন্ত সেই টানাপোড়ন অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষ করে Donald Trump-এর শুল্কনীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান এই সম্পর্ককে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ফলে, যে সম্পর্ক একসময় কানাডার অর্থনৈতিক শক্তি ছিল, তা এখন ঝুঁকির উৎসে পরিণত হয়েছে।
এই বাস্তবতায় কানাডা কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। বাণিজ্যের বৈচিত্র্যকরণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, ক্লিন এনার্জি সম্প্রসারণ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করার উদ্যোগ—সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের “স্ট্র্যাটেজিক রিসেট”। Carney-এর বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার: কোনো দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা একক অংশীদারের ওপর নির্ভর করে টেকসই হতে পারে না।
বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের অর্থনীতি এখনো সীমিত খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প—এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি রপ্তানি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা স্বল্পমেয়াদে সুবিধাজনক হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
অতএব, সময়ের দাবি হলো—
রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য
নতুন বাজারে প্রবেশ
প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন
অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা
বৈষম্যমূলক বাণিজ্য চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন
“নির্ভরতা নয়, সক্ষমতাই টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি”—এই সত্য আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। দক্ষ মানবসম্পদ, উদ্ভাবন, শিল্পায়ন এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক কাঠামোই পারে একটি দেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সাহায্য করতে।
সবশেষে বলা যায়, কানাডার অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে—
? একক নির্ভরতার গণ্ডি থেকে বের হয়ে বহুমুখী, স্থিতিশীল ও সক্ষম অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের একমাত্র টেকসই পথ।
? নীতিনির্ধারণী পলিসি ব্রিফ
অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও কৌশলগত স্বনির্ভরতা: বাংলাদেশের জন্য করণীয়
১. প্রেক্ষাপট
Mark Carney যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন
বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা বৃদ্ধি
Donald Trump-এর শুল্কনীতি আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করছে
২. মূল সমস্যা
সীমিত রপ্তানি খাত (RMG নির্ভরতা)
সীমিত বাজার (US/EU নির্ভরতা)
বৈশ্বিক ধাক্কায় উচ্চ ঝুঁকি
৩. নীতিগত লক্ষ্য
রপ্তানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা
বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস
কৌশলগত খাতে স্বনির্ভরতা
৪. প্রস্তাবিত কৌশল
? বাণিজ্য বৈচিত্র্য
আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার নতুন বাজারে প্রবেশ
আঞ্চলিক বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদার
? শিল্পখাত উন্নয়ন
আইটি ও ডিজিটাল অর্থনীতি
ফার্মাসিউটিক্যাল
কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প
? অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ
অবকাঠামো উন্নয়ন
জ্বালানি নিরাপত্তা
অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণ
? বিনিয়োগ আকর্ষণ
বিনিয়োগবান্ধব নীতি
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) সম্প্রসারণ
৫. ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
নীতিনির্ধারণে ধীরগতি
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
৬. উপসংহার
কানাডার অভিজ্ঞতা দেখায়—
? একক নির্ভরতা থেকে বের হয়ে বহুমুখী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—
আমরা কি আগাম প্রস্তুতি নেব, নাকি ভবিষ্যৎ সংকটের জন্য অপেক্ষা করব?
লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধা, সভাপতি, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক, এডমন্টন, আলবার্টা, কানাডা
******